লোকটা বলল “আমি মাজু রাজাকার, সবাই ল্যাংড়া মাজু নামেই চিনে আমারে।”- ঢাকা থেকে যাও্য়া সাংবাদিকের দল টা অবাক হয়ে গেল শুনে সঙ্গে সঙ্গে। দেখলাম আমার আশপাশের সবাই কেমন জানি চুপসে গেছে। ওহ আমার পরিচয় টা দিয়ে নেই, আমি রহমান। বেকার যুবক। চাকরীর কথা বলা ছিল কয়েক জায়গায়, হঠাত খবর এলো যে আমার মুক্তিযুদ্ধের তথ্য আনতে কোন গ্রামে যেতে হবে। এখন আমার চারদিকে মোটামোটি দেশের সেরা মানুষজন আছে। তাদের সাথে ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছি গোল হয়ে, আর আমাদের মাঝখানে ‘মাজু রাজাকার’।
মাজু রাজাকারের বয়স ষাটের মত হবে। ভুরু চিকন, কানের পাশের চুলগুলো সাদাটে হয়ে গেছে। চোখ গুলা কেমন জানি,তাকালে মনে হয় খুন করতে চায় কাউকে। পুরো দেহতে সবচেয়ে অসামঞ্জস্যপূরনো বেপার হল ডান পা টি। বগলের নিচে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ানো আছেন উনি।
সবাই খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম মাজু রাজাকারের কথা। ’৭১ এর আগের কথা বলছিলেন উনি। উনার ভাষায় ই বলি বাকিটা---
আমি থাকতাম বরইহাটা গ্রামে,শহর থেকে বহুত দূরে আমগো গ্রাম ছিল। তহন আমি টগবগা যুবক, রক্ত থাকতো গরম। এরই মদ্ধে আয়া পড়লো ২৫ শে মার্চ।
আজমল কাকার দোকানে রেডিও ছিল, বিকাল-সন্ধার দিকেই খবর শুনলাম পশ্চিম থেইক্যা পাক বাহিনী আইসে শহরে। তখনও বুঝি নাই রাইতে অই অবস্থা হইবে। আমি যখন রেডিও শুনতাছিলাম, সামনে দিয়া কদমতলীর চেম্বারের মেয়ে দেখলাম হাইটা যায়। কে কইবো, গিরহ যুদ্ধ লাগছে, গিরহ যুদ্ধ।
গেরামে আমার একটা জানের বন্ধু ছিল, ওর নাম ওসমান। বড় ভালা পোলা। ছোটবেলার কথা এখনও মনে পড়ে। একদিন ক্লাশে রাবার দেই নাই বইলা কি কান্দন ওর। আমার মা রে ও মা বইলাই ডাকতো, বাসায় ও সবাই ওরে অনেক পছন্দ করতো।
যাই হোক, এগুলা ভুমিকা ছিল আমার। এহন কাহিনীতে আসি। আমার ‘মাজু রাজাকার’ হওয়ার কাহিনী।
এপ্রিল মাসের কথা। ততদিনে দেশ মোটামোটি তছনছ হইয়া গেছে। আমাদের গ্রামেও শহর থেকে বহুত মানুষ আসছে। হঠাত একদিন ভোরে আজমল কাকা দউরাইতে দউরাইতে আইসা বললো, "তোমারে ডাকে ওসমান" ।
খালের পাড়ে গেলাম,ওখানেই থাকতাম সারাদিন দুইজন। কিছুক্ষন চুপ থাকার পর ওসমান বলে, "যাইতাসি রে আমি,দোয়া করিস"।
অবাক হয়ে গেলাম,ওর মত ছেলের সাহস দেখে। কড়া একটা ধমক দিতে যেয়েও ওর পরের কথায় থামলাম, "যাবি আমার সাথে?"
ওর কালীচর দিয়ে ইন্ডিয়া যাওয়ার বুদ্ধি ভাল ঠেকলো নাহ, কিন্তু দেশের জন্য যায়, কিছুই বলার নাই। ততদিনে মুক্তিরা দাড়াঁইতেসে মাত্র। একবার ওরে খালি জড়ায় ধরলাম,তারপর ঘুইরা দাড়ঁইলাম। না চাইয়াই কইলাম, “ওসমান, সাধীন বাংলায় দেহা হইবো রে”।
চলে আসলাম অরে ওখানেই রেখে, পরদিন শুনি ও চলে গেসে, আপনারা আমারে জিগাইবেন আমি ক্যান গেলাম না, তাই তো? বলি শুনেন-
বাপ ছিল বাতের রুগী আমার, উইঠ্যা বইতে পারতো না। মা আর বাপের আমি এক পোলা ছিলাম। খাওয়াইতে হইতো আমারি।
দেশ থাকুক, না থাকুক- না খাইয়া যদি মইরা যাইতো উনারা, আপনারা তো দেখতেন না হেগো। মুজীব সাব জেলে, দেশ চালাইতেছিল তাজউদ্দীন। ভাই সত্যি কইতাছি, আমি যাইতে চাইছিলাম। পারি নাই। চুপ হয়ে যায় মাজু রাজাকার, দুইহাত দিয়ে চোখ ডলে আবার শুরু করে উনি-
পরের মাসেই কালা পতাকা টানায় দেয় ইস্কুলে রমিজ মিয়া। আর তখন তখন ই গেরামে পাক বাহিনী ঢুকে।
ঢুকে মানে কি, সেই রকম অবস্থা। চাইরদিকে খালি আগুন, এমনও দিন গেছে, গুলির শব্দ না হুনলে মনে হইতো কি জানি নাই এহানে।
একদিন সকালে বাজারে গেছি, রমিজ মিয়া আইস্যা ডাক দিলো। শালা ছিল আল- বদরের কমান্ডার।
-মাজু শুন, ওসমানের খবর কিছু জানোস?
-না তো, ক্যা?
-নাহ এমনি, শুন মাজু, তোরে একটা কথা কই। দ্যাশের অবস্থা ভালা না, পাকিরা আয়া গেছে। আমাগো চিফ হামিদ আছে না? অই যে, গোফ আলাডা। তোর মায়ের দিকে ওর চোখ পড়ছে রে। তোর পেয়ারের দোস্ত মুক্তিতে। বলি কি, আমাগো রাজাকার বাহিনী তে আয়। মাসকাবারি বেতন পাবি,লুটের ভাগও দিমু। আর, অন্য মজা তো আছেই, চোখ টিপে কইলো রমিজ শুওরের বাচ্চাটা।
কয়েকটা গালি অনেক কষ্টে আটকাইয়্যা বাসার দিকে রওনা দিলাম। বাড়ির সামনে আয়া দঊর থেইকা দেহি দরজার কাছে লাল কালা কি জানি পইড়া আছে, কইলে হুনবেন? কাছে যায়া দেহি আমার বাপ দরজার উপর মইরা পইড়া আছে। গলায় গরতো বেয়নেটের। একটা তেলাপোকা, মনে হয় কালা ছিল, অই গরত থেইকা বাইর হইতাছে। জানেন? তেলাপোকাটার গায়ের রঙ কিন্তু লাল ছিল তহন,।
বলতে বলতে ঝরঝর করে কেদে দেয় মাজু। চুপ করে থেকে আবারো শুরু করে।
পাশের বাড়ির মজনু এসে কইলো কি হইসে আসলে। তহনও মাথায় কিছুই ঢুকে নাই আমার, খালি শুনলাম শ্যাষে কইলো আমার আম্মারে ধইরা নিয়া গেছে।
ঘরে আর ঢুকলাম না, কিয়ের যুদ্ধ। পাক- বাঙ্গালি দিয়া কি হইবো আমার মা না থাকলে। বাজারে যাইয়া রমিজরে খুইজা বাইর করলাম, আমি রাজাকারের লিস্টি তে নাম লেখাইলাম। ছেড়াঁ শাড়ির উপর যখন আমার চাদর দিয়া মা রে বাসায় আনতাছি, একবারো মনে হয় নাই ভুল কিছু করছি আমি।
তীব্র হয়ে উঠে মাজু রাজাকারের চোখগুলো হঠাত, “হ্যা ,আমি রাজাকার-আমার নাম মাজু রাজাকার।”